আগ্রার তাজমহল

আগ্রার তাজমহল ভ্রমণ গাইড: ইতিহাস, যাতায়াত, খরচ ও ভ্রমণ টিপস

ভালোবাসার চিরন্তন নিদর্শন হিসেবে ভারতের উত্তরপ্রদেশ আগ্রায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাজমহল। সম্রাট শাহজাহান তার দ্বিতীয় স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হন। তার স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি নির্মাণ করেন আগ্রার তাজমহল। এরই মধ্যে রয়েছে মমতাজের সমাধি। তাজমহলের সৌন্দর্য মুঘল স্থাপত্যশৈলীর দক্ষতা প্রমাণ করে। মুঘল আমল থেকেই এটি পৃথিবীর মানুষের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। তাজমহলকে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য বলা হয়। তাজমহল নির্মানে পারস্য, তুরস্ক ও ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর সম্মেলন ঘটেছে। এই নিবন্ধে তাজমহল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এবং ভ্রমণের দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

আগ্রার তাজমহল

আগ্রার তাজমহলের ইতিহাস

১৬২১ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী মমতাজ মহল চতুর্থ কন্যা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মমতাজের মৃত্যুতে শাহজাহান খুবই বিষন্ন হয়ে পড়েছিলেন। মমতাজের স্মৃতির রক্ষার্থে শাহজাহান তাজমহল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। তার মৃত্যুর পর থেকেই তাজমহল নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে এটি শেষ হয়।

কিন্তু দুঃখের বিষয় তাজমহল নির্মাণের কাজ শেষ হতেই শাহজাহানকে গৃহবন্দী হতে হয় নিজের ছেলে আওরঙ্গজেবের হাতে। আওরঙ্গজেব শাহজাহানকে ক্ষমতাচ্যুত করে আগ্রার কেল্লায় গৃহবন্দী করে রাখেন। তিনি জীবনের বাকি সময়টুকু সেখানেই কাটিয়েছেন এবং কেল্লার জানালা দিয়ে তাজমহলের দিকে মাঝেমধ্যে চেয়ে থাকবেন। শাহজাহানের মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাজমহলে মমতাজের সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করেন।

তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী

আগ্রার তাজমহল নির্মাণে তৎকালীন স্থাপত্যবিদরা তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছিলেন। যার কারনেই কি পৃথিবী সপ্তম আশ্চর্য হিসেবে স্থান পেয়েছে। এর নকশায় রয়েছে তুরস্ক, পারস্য এবং ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ। নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সাদা মার্বেল পাথর যেগুলো রাজস্থান থেকে আনা হয়েছিল। সাদা মার্বেল পাথরের কারণে তাজমহল একেক সময় একেক রং ধারণ করে। তাজমহলের চারপাশে রয়েছে চারটি সুউচ্চ মিনার যা তার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সমাধির মূল কেন্দ্রবিন্দুর উপরে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় গম্বুজ। এছাড়াও তাজমহলের দেওয়ালে বিভিন্ন জায়গা খোদাই করে নান্দনিক নকশা করা হয়েছে।

আগ্রার তাজমহলের দর্শনীয় স্থান

প্রধান প্রবেশদ্বার

প্রধান প্রবেশ দ্বারাকে দারজা ই রাওজা বলা হয়। এটি  লাল বেলেপাথর ও সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি একটি সুদৃশ্য রাজকীয় গেট। এটি কুরআনের ক্যালিগ্রাফি ও কারুকাজে সুশোভিত। আপনি হলে প্রবেশ করতে হয় এই প্রবেশ দ্বার দিয়ে। এই প্রবেশ দ্বারটির সৌন্দর্য অসাধারণ।যা অচিরেই পর্যটকদের বিমোহিত করে।

See also  মাউন্ট এভারেস্ট ভ্রমণ গাইড | উচ্চতা, অবস্থান ও ইতিহাস

প্রধান মুসোউসোম (মাজার ভবন)

প্রধান আগ্রার তাজমহল কমপ্লেক্স ভবন মূলত সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি ৩৫ মিটার উচ্চতার মূল গম্বুজ ও চমৎকার পাথরের কারুকাজ। ভেতরে সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের আসল সমাধি রয়েছে। সাদা পাথরের কারনে এটি নানা রঙ ধারণ করে প্রকৃতির সাথে মিশে যায়। এর দেওয়ালে রয়েছে নানা নকশাখচিত কারুকাজ। এর সৌন্দর্য পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

চারবাগ

তাজমহলের সামনেই রয়েছে পারস্য ধারার নির্মিত চারকোনা বাগান। এখানে রয়েছে নানান ফুলের বাগান এবং মানুষের চলাচলের রাস্তা। তাজমহলের একদম সামনেই রয়েছে জলফোয়ারা এবং স্বচ্ছ পানির জলাধার। যা মূল ভবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে। যার কারনে তাজমহলকে দেখতে আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে হয়।

মসজিদ ও জবাব

মূল মাজারের দুই পাশে দুটি লাল বেলেপাথরের স্থাপনা করা হয়েছিল। পশ্চিম দিকের স্থাপনাটি হলো মসজিদ এবং পূর্ব দিকের নিখুঁত মিল বজায় রাখার জন্য নির্মিত ভবনটি জবাব বা মেহমানখানা। লাল বেলি পাথরের এই দুই স্থাপনা তাজমহলের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আগ্রা ফোর্ট

তাজমহল থেকে মাত্র এক মাইল বা ২.৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক লাল কেল্লা। এখান থেকেই তৎকালীন রাজকার্য পরিচালিত হতো। আওরঙ্গজেব শাহজাহানকে এখানে বন্দী করে রেখেছিলেন।

 

আগ্রার তাজমহল কিভাবে যাবেন

তাজমহল যেতে হলে সর্বপ্রথম পাসপোর্ট এবং ভারতের টুরিস্ট ভিসা নিতে হবে। ভিসা পেয়ে গেলি আপনি খুব সহজেই তাজমহল যেতে পারবেন। এখানে তাজমহল যাওয়ার সমস্ত প্রক্রিয়া আলোচনা করা হলো।

ভিসা কিভাবে পাবেন এবং কত টাকা লাগে

বাংলাদেশীদের জন্য ভারত সরকার ভিসার মূল্য ফ্রী রেখেছে। ভিসা প্রসেসিং এর জন্য সার্ভিস চার্জ হিসাবে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে এই টাকা পরিশোধ করতে হয় । আপনি যদি কোন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে করেন তবে তাদেরকে অতিরিক্ত আরো দেড় হাজার টাকা দিতে হবে । নিজে করলে এই টাকা দেওয়া লাগে না। আবেদন করার জন্য পাসপোর্ট, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানার প্রমাণ, পেশার প্রমাণ এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা বা ব্যাংক স্টেটমেন্টের প্রয়োজন হয়।

অনলাইনে ফরম পূরণ করে ফ্রি প্রদান করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই সার্ভিস চার্জ ১৫০০ টাকা এবং সমস্ত কাগজ জমা দিতে হবে। ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভিসা হয়ে গেলে আপনাকে এসএমএস এর মাধ্যমে জানানো হবে।

See also  মাউন্ট এভারেস্ট ভ্রমণ গাইড | উচ্চতা, অবস্থান ও ইতিহাস

 

ঢাকা থেকে দিল্লি

আকাশপথে

ঢাকা থেকে দিল্লি আকাশ পথে যাওয়া যায় আবার স্থলপথে বাস বা ট্রেনে করেও যাওয়া যায়। বিমানে যাওয়া সব থেকে আরামদায়ক ক্লান্তিহীন এবং দ্রুততম। বিমানে গেলে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি পৌঁছানো যায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দিল্লি ইয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।বিমানে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকার মত লাগতে পারে।

 

স্থলপথে

ঢাকা থেকে কলকাতা

বাসে বা ট্রেনে করেও দিল্লি যাওয়া যায়। এজন্য প্রথমে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় যেতে হবে। ঢাকা থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের সরাসরি কলকাতা যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে বাসে করেও কলকাতা যাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে কলকাতায় যেতে হবে। বাসে বা ট্রেনে যেতে ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মতো খরচ হবে এবং ৮ থেকে ১২ ঘন্টা সময় লাগবে।হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে এবং কম খরচে যেতে গেলে বাসে এবং টেনে যাওয়াই সর্বোত্তম।

কলকাতা থেকে দিল্লি

কলকাতা গিয়ে সর্বপ্রথম শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশনে যেতে হবে। সেখান থেকে রাজধানী এক্সপ্রেস বা দুরন্ত এক্সপ্রেসে করে দিল্লি যেতে হবে। সময় লাগবে ১৭ থেকে ১৮ ঘন্টা। দিল্লি থেকে যেকোন ট্রেনে দুই ঘন্টার মধ্যে আগ্রায় যাওয়া যায়। এই যাত্রাটি খুবই আরামদায়ক। কিভাবে খুব সহজেই দিল্লি পৌঁছানো যায়। তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে সহজেই দিল্লি যাওয়া যায়।

কলকাতা থেকে সরাসরি আগ্রা

কলকাতা থেকে সরাসরি যাওয়ার জন্য ট্রেন রয়েছে। হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে হাওড়া যোধপুর এক্সপ্রেস, হাওড়া কালকা মেলই বা চম্বল এক্সপ্রেস সরাসরি আগ্রা ট্রেন পরিচালনা করে থাকে। এই ট্রেনে আপনি সরাসরি আগ্রা ফোর্ট স্টেশনে নামতে পারবেন। সময় লাগবে ২০ থেকে ২৪ ঘন্টা। সরাসরি আগ্রা যেতে তিন হাজার থেকে ৪৫০০ টাকার মধ্যে যাওয়া যায়।

দিল্লি থেকে আগ্রা

দিল্লী রেলস্টেশন বা হযরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন বহু ট্রেন আগ্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যেহ সময় লাগে দুই ঘণ্টার মতো। খুব সহজেই দিল্লি থেকে আগ্রা যাওয়া যায়। এছাড়া বাসে করে দিল্লির কাশ্মীর গেট বা আনন্দবিহার বাস টার্মিনাল থেকে আগ্রা যেতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা। এছাড়াও ছাড়া দিল্লি থেকে কার বা ক্যাবে করে সরাসরি আগ্রা যাওয়া যায়। আগ্রা স্টেশনে নেমে অটো রিক্সায় করে সরাসরি তাজমহলের গেটে যাওয়া যায়।

See also  মাউন্ট এভারেস্ট ভ্রমণ গাইড | উচ্চতা, অবস্থান ও ইতিহাস

থাকবেন কোথায়

আগ্রা বা দিল্লিতে থাকার জন্য মাঝারি থেকে ভালো মানের হোটেল রয়েছে। সেখানে ১৫০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে ভালো ডাবলবেড রুম পাওয়া যায়। আগ্রায় কয়েকটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য হোটেল হল হোটেল সাফারি, দা আগ্রা গ্র্যান্ডে, টুরিস্ট রেস্ট হাউস ও থমাস হোম স্টে। হোটেলে খুব সহজেই আপনি থাকতে।

খাবেন কোথায়

রাতে খাওয়ার জন্য মাঝারি থেকে উচ্চমানের বেশ অনেকগুলো হোটেল রয়েছে সেখানে আপনি তিন বেলা খাবার পাবেন। সেখানে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ভালো খেতে পারবেন। যে হোটেলে থাকবেন সেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

তাজমহল ভ্রমণ টিপস

  • শুক্রবার তাজমহল বন্ধ থাকে তাই এদিন না যাওয়াই ভালো
  • সূর্যোদয়ের ৩০ মিনিট আগে থেকে এবং সূর্যাস্তের ৪৫ মিনিট আগ পর্যন্ত তাজমহল খোলা থাকে
  • তাজমহলের প্রবেশ মূল্য সার্কভুক্ত দেশের জন্য ৫১০ থেকে পাশের ত্রিশ রূপের মধ্যে এবং মূল গম্বুজের ভিতরে ঢুকতে আরও ২০০ রুপির টিকিট কাটতে হয়
  • যদি লাইন এড়াতে চান তাহলে অনলাইনে টিকিট কাটতে পারে
  • সর্বদা পাসপোর্ট সাথে রাখুন

 

FAQ

১. আগ্রার তাজমহল কে নির্মাণ করেছিলেন?
মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন।

২. আগ্রার তাজমহল নির্মাণ করতে কত বছর সময় লেগেছিল?
তাজমহলের মূল সমাধি নির্মাণে প্রায় ১২ বছর সময় লেগেছিল এবং পুরো কমপ্লেক্স সম্পন্ন হতে প্রায় ২২ বছর লাগে।

৩. আগ্রার তাজমহল ভ্রমণের জন্য কোন সময় সবচেয়ে ভালো?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস তাজমহল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

৪. আগ্রার দেখতে গেলে কত সময় প্রয়োজন?
তাজমহল ঘুরে দেখতে সাধারণত ২–৩ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন।

৫. আগ্রার তাজমহল ভ্রমণে কীভাবে যাওয়া যায়?
বাংলাদেশ থেকে বিমানে ভারতের দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে ট্রেন, বাস বা গাড়িতে আগ্রা পৌঁছানো যায়।

 

আরো পড়ুন

Sohag
Sohag

আমি একজন ভ্রমণপ্রেমী ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা। দেশ-বিদেশের দর্শনীয় স্থান, ভ্রমণ গাইড, যাতায়াত, আবাসন ও প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য।

Articles: 6