কাপ্তাই লেক

কাপ্তাই লেক-ইতিহাস, কোথায় অবস্থিত, কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন

কাপ্তাই লেক

বাংলাদেশ তথা এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ হচ্ছে কাপ্তাই লেক। ভ্রমণপ্রেমীদের কাপ্তাই লেক একটি জনপ্রিয় স্থান। ছোট -বড় পাহাড় আর জলভূমি নিয়ে এক নৈসর্গিকী দৃশ্য কাস্তাই লেক। অসংখ্য পাহাড়ি দ্বীপ আর সবুজে ঢাকা ভূভাগ দেখে চোখে জুড়িয়ে যায়। প্রকৃতি নিজেই যখন শিল্পী হয়ে যায় তখন প্রতিটি সৃষ্টি এক একটি শিল্পকর্ম হয়ে যায়। কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য দেখে মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজেই রং তুলি দিয়ে ছবি একে রেখেছে। লেকের জলে যখন নীল আকাশ প্রতিফলিত হয় তখন মনে হয় যেন স্বর্গীয় দৃশ্য। এছাড়াও চোখে পড়ে পাহাড়ি ঝর্ণা এবং আদিবাসীদের ছোট ছোট গ্রাম। তাদের বিচিত্র জীবনাচার ও সংস্কৃতি পর্যাটকদের বিমোহিত করে। বর্ষায় পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো নতুন যৌবন ফিরে পায়। এই ঝর্ণার রূপ পর্যটকদের পুলকিত করে।

 

কাপ্তাই লেকের ইতিহাস

পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কর্ণফুলী নদীতে বাধ নির্মাণ করে। ফলে কৃষি জমি ডুবে এই লেকের সৃষ্টি হয়। এই বাধ থেকে দেশের সর্বপ্রথম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়। যা কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নামে পরিচিত। হ্রদটি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান হয়ে ওঠে। দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক এটি দেখতে আসা শুরু করে। সেখান থেকে বাংলাদেশের পর্যাটন শিল্পের বড় খাত হিসেবে দেশের অর্থীতিতে অবদান রাখে কাপ্তাই লেক। এর

 

কাস্তাই লেকের আশেপাশে জনজীবন ও সংস্কৃতি

মন মাতানো সৌন্দর্যমন্ডিত কাপ্তাই হ্রদের আশেপাশে বহু উপজাতিদের বসবাস রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গা ও ত্রিপুরা। এই হ্রদেকে কেন্দ্র করে তাদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এসব উপজাতিদের জীবিকার প্রধান উৎস হল মাছ ধরা ও মাছ চাষ করা। যেহেতু এখানে একটি বিশাল উন্মুক্ত জলরাশি রয়েছে তাই মৎস্য চাষ ও ব্যবসা করা তাদের জন্য সহজ। এছাড়া পাহাড়ের গায়ে জুম চাষের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধরনের ফসল ও শাকসবজি উৎপাদন করে। এখানে বহু প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয়।

এই উপজাতিদের আরেকটি বড় অংশ পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত রয়েছে। তারা ছোট ছোট নৌকা বা বোটে করে পর্যটকদের পরিবহন করে, এছাড়াও কটেজ বা রিসোর্ট পরিচালনা করে। এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো স্বাদ ও রান্নার শৈলীর দিক থেকে অনন্য। তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে পাজন, বাঁশ কোড়ল, হেবাং বা সুময়ে, নাগ্নি, বিন্নি চালের পিঠা ও ভাত, পাহাড়ি জুস ও পানীয় ইতইত্যাদি। কাপ্তাই লেকে গেলে এই খাবার গুলোর স্বাদ না নিলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই খাবারগুলো কাপ্তাই লেকের মাঝে অবস্থিত বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট গুলোতে পাওয়া যায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রেস্টুরেন্ট হলো

See also  কেওক্রাডং ভ্রমণ গাইড: ইতিহাস, যাওয়া ও খাওয়ার উপায়, খরচ ও ভ্রমণ টিপস

কাপ্তাই লেকের অবস্থান

বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কাপ্তাই লেক। এর আয়তন প্রায় ১১০০০ বর্গ কিলোমিটার। এটি এশিয়া সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ। রাঙামাটি জেলার এর সীমানা আছে কিন্তু মূল জলরাশি কাপ্তাই উপজেলায়। বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় জেলা রাঙামাটি। এই জেলার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে কাপ্তাই লেকের অবস্থান।

কাপ্তাই লেকের দর্শনীয় স্থানসমূহ

কাপ্তাই হ্রদ এত বড় যে সারাদিন বোটে করে ঘুরলেও এটি শেষ করা যাবে না। এই অথৈ জলরাশি আর সবুজের সমারোহ পাঠক চিত্তিকে অনায়াসেই মুগ্ধ করে। সারাদিন ঘুরলেও যেন ঘুরার আকাঙ্ক্ষা মনে থেকেই যায়। এখানে রয়েছে অসংখ্য পাহাড়ির দ্বীপ, ঝর্ণা, আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, ঝুলন্ত ব্রিজ। এছাড়াও এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার গুলো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কাপ্তাই লেকের দর্শনীয় স্থানসমূহ তুলে ধরা হলো।

আদিবাসী মার্কেট

রাঙামাটি শহরের থেকে স্বল্প দূরত্বে ব কাপ্তাই হ্রদের মাঝে অবস্থিত আদিবাসী মার্কেট। এখানে আদিবাসীদের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র পাওয়া যায়। তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বিভিন্ন দ্রব্য পাওয়া যায়। এখানে বিভিন্ন পাহাড়ি ফলমূলও পাওয়া যায়। তাদের নিজেদের হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গি, চাদর, গামছা ও বিভিন্ন পোশাক পাওয়া যায়। এছাড়াও এখানে রয়েছে এক বিশাল বৌদ্ধ মূর্তি।

শুভলং ঝর্ণা

আদিবাসী মার্কেটে পরেই শুভলং ঝর্ণার অবস্থান। রাঙ্গামাটি শহর থেকে বোটে করে এখানে যেতে হয়। বর্ষাকালে ঝরনাটি তার যৌবন ফিরে পায়। পাথরে পাহাড়ের উপর থেকে হ্রদের আছড়ে পরে সব শতশত লিটার পানি। সৃষ্টি হয় একটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

ঝুলন্ত ব্রিজ

কাপ্তাই লেকে অন্যতম একটি প্রধান আকর্ষণ ঝুলন্ত ব্রিজ। রাঙ্গামাটি শহর থেকে বোটে করে এই ব্রিজে যেতে হয়। এই রিজের দৈর্ঘ্য ৩৩৫ মিটার। কাপ্তাই হ্রদের দুটি পাহাড়কে সংযুক্ত করেছে এটি। এর উপর দাঁড়ালে লেক আর পাহাড়ের অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে।

See also  কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান, খরচ ও ভ্রমণ টিপস

পলওয়েল পার্ক

রাঙ্গামাটি শহরের পাশে কাপ্তাইল হ্রদের তীরে অবস্থিত পলওয়েল পার্ক। এটি একটি অত্যাধুনিক পার্ক। এখানে রয়েছে

কর্ণফুলী বাধ

রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর উপর অবস্থিত কর্ণফুলী বাধ। এই বাঁধের ফলে সৃষ্টি হয়েছে কাপ্তাই হ্রদ। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কাস্তাই লেকের এটিও একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

কাপ্তাই লেকে যাওয়ার উপায়

রাঙ্গামাটি যাওয়ার অনেকগুলো উপায় রয়েছে তবে সবচাইতে সহজ উপায় হল বাস। ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটিতে বাস যাতায়াত করে। গাড়ির ধরন ভেদে বিভিন্ন দাম হয়। নন এসি ৭০০- ১১০০ আর এনি ১১০০ থেকে ১৮০০/২০০০ এর মধ্যে। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। আবার ঢাকা থেকে প্লেনেও সরাসরি চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। এরপর চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাঙামাটি আসা যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাস স্টান্ড থেকে সরাসরি রাঙামাটি বাস যায়। চট্টগ্রাম থেকে ২০০/৩০০ টাকা নেয়। এছাড়াও বান্দরবান থেকে ও বাসে রাঙামাটি যাওয়া যায়। রাঙামাটি থেকে কাপ্তাই উপজেলায় গিয়ে কাপ্তাই লেকে যাওয়া যায় আবার রাঙামাটি পুরনো বাস স্ট্যাড থেকে নৌকা বা স্পিড বোটের করে কাপ্তাই লেকে ঘোরা যায়।

কাপ্তাই লেকে ঘোরার উপায়

কাপ্ত লেকে ঘুরতে হলে নৌকা বা হাউস বোট ভাড়া করতে হবে। হোটেলে যোগাযোগ করলে নৌকা বা হাউস বোট তারা ঠিক করে দেয়। নৌকার আকার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় ভালো মানের হাউজ বোট পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন ঘাটে নৌকা হাউস বোট বা স্পিড বোট পাওয়া যায়। তবে দামাদামি করে দাম ঠিক করতে হবে।

কাপ্তাই লেকে খাওয়ার উপায়

এখানে খাওয়ার জন্য ছোট বড় বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁ আছে। লেকে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে খাওয়া হোটেলে পাওয়া যায়। আদিবাসী ও বাঙালি উভয় হোটেল পাওয়া যায়। এসব আদিবাসী রেস্তোরাঁ গুলো পাওয়া যায় বাম্বু চিকেন যা এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার।

See also  কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান, খরচ ও ভ্রমণ টিপস

কাপ্তাই লেকে থাকবেন কোথায়।

কাপ্তাই থাকার জায়গার অভাব নেই। এখানে অসংখ্য হোটেল আছে। রাঙামাটি শহরে ছোটখাটো হোটেলে থেকে শুরু বিলাসবহুল পাচতারকা হোটেলে অভাব নেই। এছাড়া কাপ্তাই লেকে মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য হোটেল আছে। এছাড়া আছে ক্যাম্প করে থাকার সুব্যবস্থা। কাপ্তাই লেকের থাকার জন্য কিছু হোটেল হল

হোটেলের নাম এলাকা/অবস্থান মূল বৈশিষ্ট্য আনুমানিক ভাড়া (প্রতি রাত)
অরণ্যক হলিডে রিসোর্ট রাঙামাটি সেনানিবাস সুরক্ষিত পরিবেশ ও লেক ভিউ ১১,৪৯০ টাকা (সাধারণ অতিথিদের জন্য)
লেকশোর রিসোর্ট কাপ্তাইমুখ, কাপ্তাই ইনফিনিটি পুল ও আধুনিক সুবিধা মাঝারি থেকে উচ্চ
হোটেল আল রাইয়ান জেটিঘাট, কাপ্তাই বাজেট-বান্ধব ও সহজলভ্য ৬০০ – ৩,০০০ টাকা

 

FAQ

১. কাপ্তাই লেক কেন বাংলাদেশের অন্যান্য পর্যটন স্থান থেকে আলাদা?
কাপ্তাই লেক পাহাড়, নীল জলরাশি ও সবুজ প্রকৃতির অসাধারণ সমন্বয়ের জন্য বিশেষ। নৌভ্রমণের মাধ্যমে লেকের পাহাড়ি সৌন্দর্য কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।

২. কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণের জন্য কোন সময়টি সবচেয়ে ভালো?
শীতকাল ও শরৎকালের তুলনামূলক পরিষ্কার আবহাওয়া নৌভ্রমণের জন্য আরামদায়ক। তবে বর্ষায় লেক ও আশপাশের পাহাড় আরও সবুজ ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে।

৩. কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণের সময় কী কী দেখা যায়?
নৌভ্রমণের সময় পাহাড়ঘেরা জলরাশি, ছোট ছোট দ্বীপ ও চর, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এবং লেকের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

৪. কাপ্তাই লেক ভ্রমণে একদিনে কী কী করা সম্ভব?
একদিনের ভ্রমণে নৌভ্রমণ, পাহাড়ি প্রকৃতি উপভোগ, স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা সম্ভব।

৫. কাপ্তাই লেক ভ্রমণের আগে কী কী বিষয় মনে রাখা উচিত?
নৌভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভালো। লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, প্রয়োজনীয় পানি ও সানপ্রোটেকশন সঙ্গে রাখা এবং প্রকৃতি পরিষ্কার রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আরো পড়ুন

Sohag
Sohag

আমি একজন ভ্রমণপ্রেমী ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা। দেশ-বিদেশের দর্শনীয় স্থান, ভ্রমণ গাইড, যাতায়াত, আবাসন ও প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য।

Articles: 6